আসিফ কারিম, হরিশ্চন্দ্রপুর: সংসারের অভাব ঘোচাতে, পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে এবং একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন নিয়ে মহারাষ্ট্রের নাসিকে কাজ করতে গিয়েছিলেন মালদা জেলার তিন যুবক। কিন্তু সেই স্বপ্ন যে এভাবে মাঝপথে থেমে যাবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। ভয়াবহ পথ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন মালদার তিন যুবক-সহ মোট চারজন। দুর্ঘটনায় আরও ১২ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। মৃতদের মধ্যে তিনজন মালদার বাসিন্দা এবং অপর একজন বিহারের কিশানগঞ্জের বাসিন্দা।মৃতদের দেহ বর্তমানে মহারাষ্ট্রের নাসিক জেলার সিন্নার গ্রামীণ হসপিটাল-এ রয়েছে।
মালদার মৃত তিন যুবক হলেন সাজামান আলি, মহঃ বিশু এবং খুরশীদ আলম। তাঁদের প্রত্যেকের মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক একটি পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই, ভবিষ্যতের স্বপ্ন এবং অসংখ্য না বলা কথা। তাঁদের আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারগুলির ভবিষ্যৎ ঘিরে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।
সাজামান আলি (২৩) পিতা ফকির মহঃ বাড়ি দক্ষিণ তালশুর (গহমা), মালিওর-২ এলাকায়। প্রায় তিন বছর আগে পার্শ্ববর্তী রাজ্যের ছোট লক্ষ্মণপুরে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। সংসারে রয়েছেন স্ত্রী রেশমি খাতুন এবং তাঁদের দুই বছরের এক কন্যাসন্তান। বর্তমানে তাঁর স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে ভিনরাজ্যে কাজ করতে গিয়েছিলেন সাজামান। কিন্তু পরিবারের জন্য উপার্জন করতে গিয়েই তাঁকে হারাতে হল প্রাণ। বাবার অপেক্ষায় থাকা ছোট্ট মেয়েটি হয়তো এখনও বুঝতে পারেনি, তার বাবা আর কোনও দিন ফিরে আসবে না। অন্যদিকে, নতুন সন্তানের আগমনের অপেক্ষায় থাকা স্ত্রীকে এখন স্বামীকে হারানোর অসহনীয় শোকের পাশাপাশি অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়েও চিন্তা করতে হচ্ছে। একদিকে স্বামী হারানোর যন্ত্রণা, অন্যদিকে ছোট্ট মেয়েকে বড় করে তোলা এবং নতুন সন্তানের দায়িত্ব সব মিলিয়ে পরিবারটির সামনে এখন এক কঠিন জীবনসংগ্রাম।

মৃত মহঃ বিশুর বয়স ২১ পিতা আসামুদ্দিন। তাঁর বাড়ি গহমাবাদ, মালিওর-১ এলাকায়। পরিবারে পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, মাত্র চার মাস আগে বিয়ে হয়েছিল মহঃ বিশুর। তাঁর স্ত্রী বর্তমানে দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা। নতুন সংসার শুরু করার পর স্বামী-স্ত্রী দু’জনের চোখেই ছিল ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা স্বপ্ন। অনাগত সন্তানকে ঘিরেও হয়তো তৈরি হচ্ছিল নতুন নতুন পরিকল্পনা। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূর্ণ হওয়ার আগেই এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় সব শেষ হয়ে গেল। যে স্ত্রী কয়েক মাস আগেও নতুন জীবন শুরু করেছিলেন, তাঁকেই এখন স্বামীকে হারানোর শোক নিয়ে অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ ভাবতে হচ্ছে। সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার আগেই তার বাবার ছায়া হারিয়ে যাওয়ার এই বেদনা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। মহঃ বিশুর মৃত্যুতে শুধু একজন যুবকের প্রাণহানি ঘটেনি, ভেঙে গিয়েছে একটি সদ্যগড়া সংসারের স্বপ্নও।
তৃতীয় মৃত যুবক খুরশীদ আলমের বয়স মাত্র ১৭ বছর। তাঁর বাড়ি আমডোল ঘাট এলাকায়। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি মেজো। তাঁর বাবা মোহাম্মদ রায়হান-ও পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। যে বয়সে পড়াশোনা, স্বপ্ন দেখা এবং জীবনের পথ তৈরি করার কথা, সেই বয়সেই খুরশীদের জীবন থেমে গেল। পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁরও হয়তো অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা সেই সম্ভাবনাকে চিরতরে শেষ করে দিল। ছেলেকে হারিয়ে তাঁর পরিবারের সদস্যদের কাছে এই শোক সহজে কাটিয়ে ওঠার নয়।
এই দুর্ঘটনায় মোট চারজনের ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। মৃতদের মধ্যে মালদার তিন যুবক এবং বিহারের কিশানগঞ্জের একজন রয়েছেন। পাশাপাশি ১২ জন আহত হয়েছেন। আহতদের বর্তমান শারীরিক অবস্থা এবং দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
কাজের সন্ধানে প্রতিদিন বাংলার বহু যুবককে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিতে হয়। পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগানো এবং সংসারের অভাব দূর করাই তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু এই পরিযায়ী শ্রমিকদের কেউ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালে তাঁদের পরিবারকে একসঙ্গে হারাতে হয় প্রিয়জন ও জীবিকার প্রধান অবলম্বন। নাসিকের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ফের সেই কঠিন বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এল। সাজামানের ছোট্ট কন্যা ও অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী, মহঃ বিশুর অনাগত সন্তান এবং খুরশীদের শোকাহত পরিবার প্রত্যেকের ভবিষ্যৎ এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে।
বর্তমানে মৃতদেহগুলি নাসিকের সিন্নার গ্রামীণ হাসপাতালে রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের কাছে প্রিয়জনের দেহ বাড়িতে ফিরিয়ে আনা এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয়। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের দ্রুত উদ্যোগ, প্রয়োজনীয় পরিবহণের ব্যবস্থা এবং আহতদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি মৃতদের পরিবারগুলিকে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রাপ্য আর্থিক সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে দুই অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর ভবিষ্যৎ, তাঁদের অনাগত সন্তান এবং ছোট্ট কন্যাসন্তানটির কথা মাথায় রেখে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মানবিক সহায়তা প্রত্যাশা করছেন এলাকাবাসী।
প্রিয়জনের মৃত্যু কোনও ক্ষতিপূরণে পূরণ হওয়ার নয়। তবুও এই অসহায় পরিবারগুলির পাশে দাঁড়ানো সমাজ ও প্রশাসনের দায়িত্ব। যে যুবকেরা পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিলেন, তাঁদের নিথর দেহ ফেরার অপেক্ষায় এখন স্বজনদের চোখে জল। নাসিকের এই দুর্ঘটনা শুধু তিনটি পরিবারের নয়, গোটা এলাকার কাছে এক গভীর বেদনার ঘটনা। মৃতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছেন এলাকাবাসী।
নতুন গতি 




















