নাজমুস সাহাদাত , কালিয়াচক: মালদহ জেলার কালিয়াচক–১ ব্লকের সুজাপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের ছোট সুজাপুর গ্রামের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সমাজসেবী ও প্রাক্তন জেলা পরিষদ সদস্য আব্দুল মালেকের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ সুজাপুর-সহ সমগ্র কালিয়াচক। মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট দুপুর প্রায় ১টা ৩০ মিনিটে কলকাতার একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৮৭ বছর। দীর্ঘ সাত বছর ধরে বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি।
আব্দুল মালেক ছিলেন শিক্ষা, সমাজসেবা এবং জনজীবনের এক সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর অসামান্য মেধার পরিচয় মিলেছিল। কালিয়াচক হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় তৎকালীন কালিয়াচক এলাকার মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে তিনি নজর কেড়েছিলেন। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে গাজোলের লক্ষ্মীপুর মাদ্রাসায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬৬ সালে নয়মৌজা সুবহানিয়া হাই মাদ্রাসায় সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৮১ সালে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৯৯ সালে অবসর গ্রহণ পর্যন্ত দক্ষতা, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্ব দেন। তাঁর শিক্ষাদর্শন, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধ আজও অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীর স্মৃতিতে অম্লান।
শিক্ষাক্ষেত্রের পাশাপাশি রাজনৈতিক জীবনেও তিনি ছিলেন সমানভাবে সফল। ১৯৮৩ সালে জাতীয় কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে প্রথমবার মালদহ জেলা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে মোট চারবার জেলা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে জেলার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এক সময় জেলা পরিষদের পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। গ্রামীণ পরিকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা বিস্তার এবং জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে তাঁর ভূমিকা এলাকার মানুষের কাছে আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ছিল অনন্য। তিনি প্রায় এক দশক ধরে সুজাপুর কাদেরিয়া পাবলিক লাইব্রেরি অ্যান্ড অ্যাথলেটিক ক্লাবের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সুজাপুর গার্লস হাই স্কুল এবং সুজাপুর মাদ্রাসা জামেউল উলুম প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় সুপরামর্শদাতা হিসেবে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি সুজাপুর জামে মসজিদ মারকাজের সম্পাদক এবং নয়মৌজা ঈদগাহ কমিটির দীর্ঘদিনের সভাপতি হিসেবে ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
তাঁর মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবার নয়, গোটা এলাকার শিক্ষাঙ্গন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল এক অভিভাবককে হারাল বলে মনে করছেন এলাকাবাসী। তাঁর কাছে শিক্ষালাভ করা বহু ছাত্র বর্তমানে রাজ্য ও দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত। তাঁরা সামাজিক মাধ্যমে এবং ব্যক্তিগতভাবে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
মৃত্যুকালে তিনি দুই পুত্র, এক কন্যা, নাতি-নাতনি, আত্মীয়-স্বজন এবং অসংখ্য প্রাক্তন ছাত্র, শুভানুধ্যায়ী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
বুধবার, ৫ আগস্ট সকাল ৯টায় নয়মৌজা ঈদগাহ ময়দানে তাঁর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষাবিদ, সমাজসেবী, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ উপস্থিত থেকে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।
আব্দুল মালেকের প্রয়াণে সমগ্র সুজাপুর, কালিয়াচক তথা মালদহ জেলায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একজন আদর্শ শিক্ষক, দূরদর্শী শিক্ষাপ্রশাসক, দক্ষ জনপ্রতিনিধি ও নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবী হিসেবে তাঁর অবদান দীর্ঘদিন মানুষের হৃদয়ে অমলিন থাকবে। শিক্ষা ও মানবসেবার প্রতি তাঁর আজীবনের নিষ্ঠা আগামী প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
নতুন গতি 



















