২৭ অগাস্ট ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩
২৭ অগাস্ট ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩

৪১৩৩ স্কুলে পড়ুয়াই নেই, শিক্ষক ১৯,৫০২! এক শিক্ষকের কাঁধে ২.২৯ লক্ষ পড়ুয়া, বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থার বেহাল ছবি কেন্দ্রের রিপোর্টে

নিজস্ব সংবাদদাতা: পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থার অন্তঃসারশূন্যতা ও চরম বৈষম্যের এক উদ্বেগজনক ছবি উঠে এল কেন্দ্রীয় সরকারের ইউডিআইএসই প্লাস ( ইউনিফায়েড ডিস্ট্রিক্ট ইনফরমেশন সিস্টেম ফর এডুকেশন প্লাস) রিপোর্টে। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের পরিসংখ্যান বলছে, রাজ্যের ৪,১৩৩টি স্কুলে কোনও পড়ুয়াই নথিভুক্ত নেই। অথচ ওই স্কুলগুলিতে কর্মরত রয়েছেন ১৯,৫০২ জন শিক্ষক। দেশের মোট পড়ুয়াশূন্য ৫,৬৬৩টি স্কুলের মধ্যে প্রায় ৭৩ শতাংশই পশ্চিমবঙ্গে। এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা উত্তরপ্রদেশে এমন স্কুলের সংখ্যা ৩১৩।
একই সঙ্গে উল্টো ছবিও আরও বেশি উদ্বেগের। রাজ্যের ৬,৭৬৯টি স্কুলে মাত্র একজন করে শিক্ষক রয়েছেন। সেখানে পড়াশোনা করছে ২,২৯,৫৬৯ জন পড়ুয়া। অর্থাৎ একদিকে পড়ুয়াশূন্য স্কুলে বিপুল শিক্ষক, অন্যদিকে একজন শিক্ষকের কাঁধে কার্যত বিপুল সংখ্যক পড়ুয়ার দায়িত্ব—শিক্ষক বণ্টনের এই চরম অসামঞ্জস্য রাজ্যের শিক্ষা প্রশাসনের কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
কেন্দ্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, গত বছর রাজ্যে পড়ুয়াশূন্য স্কুলের সংখ্যা ছিল ৩,৮১২। সেই সময় ওই স্কুলগুলিতে শিক্ষক ছিলেন ১৭,৯৬৫ জন। এক বছরের ব্যবধানে পড়ুয়াশূন্য স্কুলের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪,১৩৩ এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষক সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯,৫০২। ফলে তথ্যের এই বৈপরীত্য ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—যে সব স্কুলে পড়ুয়াই নেই, সেখানে এত শিক্ষক কেন? আবার যেখানে পড়ুয়ার সংখ্যা রয়েছে, সেখানে শিক্ষক ঘাটতি কেন?
যদিও এই পরিসংখ্যানের ব্যাখ্যায় ভিন্ন যুক্তি দিয়েছে রাজ্য সরকার। স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মণ-এর দাবি, পড়ুয়াশূন্য স্কুলের সংখ্যার একটা বড় অংশের ক্ষেত্রে তথ্য আপলোডের গাফিলতি রয়েছে। বহু বেসরকারি স্কুল কেন্দ্রীয় পোর্টালে শিক্ষকদের তথ্য আপলোড করলেও পড়ুয়াদের তথ্য যথাযথ ভাবে আপলোড করেনি। ফলে ইউডিআইএসই প্লাস তথ্যভাণ্ডারে সংশ্লিষ্ট স্কুলগুলিতে পড়ুয়ার সংখ্যা ‘শূন্য’ দেখাচ্ছে।
তবে সমস্যা যে শুধুমাত্র তথ্যগত ত্রুটিতে সীমাবদ্ধ নয়, রিপোর্টের অন্য পরিসংখ্যানেই তার ইঙ্গিত স্পষ্ট। রাজ্যের মোট ৯৩,১৪৭টি স্কুলের প্রায় ৮ শতাংশে পড়ুয়ার সংখ্যা ১০ জনেরও কম। বিপরীতে প্রায় ৮.৫ শতাংশ স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা ৫০০-র বেশি। অর্থাৎ একই রাজ্যে কোথাও শ্রেণিকক্ষ কার্যত পড়ুয়াশূন্য, আবার কোথাও একজন শিক্ষকের উপরেই বিপুল সংখ্যক পড়ুয়ার শিক্ষাদানের দায় বর্তাচ্ছে।
শিক্ষক-পড়ুয়া অনুপাতেও পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান উদ্বেগজনক। রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজ্যে শিক্ষক-পড়ুয়া অনুপাত ৩০, যা দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। পরিকাঠামোর ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। রাজ্যের ৯৩,১৪৭টি স্কুলের মধ্যে মাত্র ২৩,৮৯৪টি স্কুলে কম্পিউটার এবং ১৮,৩৭৪টি স্কুলে ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে।
এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে শিক্ষক নিয়োগের দীর্ঘস্থায়ী সঙ্কটের কথাও উঠে এসেছে। স্কুলশিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, গত ১৫ বছরে কার্যত কোনও শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ এবং পরবর্তী আইনি জটিলতার জেরে শিক্ষা ব্যবস্থায় যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি সরকারের।
শিক্ষক বণ্টনের ভারসাম্য ফেরাতে ইতিমধ্যেই ‘র‍্যাশনালাইজেশন’-এর পথে হাঁটার কথা জানিয়েছে রাজ্য। যে সব স্কুলে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত শিক্ষক রয়েছেন, সেখান থেকে শিক্ষক বদলি করে শিক্ষকহীন বা এক-শিক্ষক বিশিষ্ট স্কুলে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। চলতি বছরের শেষের মধ্যে পরিস্থিতির বড় অংশের পরিবর্তন হবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।
তবে অতীতের ক্যাগ রিপোর্টও রাজ্যের স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থার শিক্ষক-সঙ্কট ও অসামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। সেখানে ৫২০টি স্কুলে কোনও শিক্ষক না থাকা সত্ত্বেও ৮,৫৯৬ জন পড়ুয়ার উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। উচ্চ প্রাথমিকের পর ২৮ থেকে ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থী স্কুলছুট হওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছিল। ফলে ইউডিআইএসই প্লাস রিপোর্টের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান নতুন করে সামনে আনল বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থার এক গভীর বৈপরীত্য—কোথাও পড়ুয়া নেই, অথচ শিক্ষক রয়েছেন হাজারে হাজারে; আবার কোথাও একজন শিক্ষককেই সামলাতে হচ্ছে হাজারো পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ। তথ্যের গরমিল দ্রুত সংশোধন এবং শিক্ষক নিয়োগ ও বণ্টনে স্থায়ী ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা না গেলে এই বৈষম্যের অভিঘাত যে সরাসরি পড়ুয়াদের ভবিষ্যতের উপর পড়বে, তা নিয়ে সংশয় নেই।

একই দিনে ১০ নবজাতকের মৃত্যু, মালদা মেডিকেলে তলব স্বাস্থ্যভবনের রিপোর্ট

নতুন গতি © All rights reserved.| Developed by eTech Builder

৪১৩৩ স্কুলে পড়ুয়াই নেই, শিক্ষক ১৯,৫০২! এক শিক্ষকের কাঁধে ২.২৯ লক্ষ পড়ুয়া, বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থার বেহাল ছবি কেন্দ্রের রিপোর্টে

আপডেট : ২৭ অগাস্ট ২০২৬, বৃহস্পতিবার
নিজস্ব সংবাদদাতা: পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থার অন্তঃসারশূন্যতা ও চরম বৈষম্যের এক উদ্বেগজনক ছবি উঠে এল কেন্দ্রীয় সরকারের ইউডিআইএসই প্লাস ( ইউনিফায়েড ডিস্ট্রিক্ট ইনফরমেশন সিস্টেম ফর এডুকেশন প্লাস) রিপোর্টে। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের পরিসংখ্যান বলছে, রাজ্যের ৪,১৩৩টি স্কুলে কোনও পড়ুয়াই নথিভুক্ত নেই। অথচ ওই স্কুলগুলিতে কর্মরত রয়েছেন ১৯,৫০২ জন শিক্ষক। দেশের মোট পড়ুয়াশূন্য ৫,৬৬৩টি স্কুলের মধ্যে প্রায় ৭৩ শতাংশই পশ্চিমবঙ্গে। এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা উত্তরপ্রদেশে এমন স্কুলের সংখ্যা ৩১৩।
একই সঙ্গে উল্টো ছবিও আরও বেশি উদ্বেগের। রাজ্যের ৬,৭৬৯টি স্কুলে মাত্র একজন করে শিক্ষক রয়েছেন। সেখানে পড়াশোনা করছে ২,২৯,৫৬৯ জন পড়ুয়া। অর্থাৎ একদিকে পড়ুয়াশূন্য স্কুলে বিপুল শিক্ষক, অন্যদিকে একজন শিক্ষকের কাঁধে কার্যত বিপুল সংখ্যক পড়ুয়ার দায়িত্ব—শিক্ষক বণ্টনের এই চরম অসামঞ্জস্য রাজ্যের শিক্ষা প্রশাসনের কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
কেন্দ্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, গত বছর রাজ্যে পড়ুয়াশূন্য স্কুলের সংখ্যা ছিল ৩,৮১২। সেই সময় ওই স্কুলগুলিতে শিক্ষক ছিলেন ১৭,৯৬৫ জন। এক বছরের ব্যবধানে পড়ুয়াশূন্য স্কুলের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪,১৩৩ এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষক সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯,৫০২। ফলে তথ্যের এই বৈপরীত্য ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—যে সব স্কুলে পড়ুয়াই নেই, সেখানে এত শিক্ষক কেন? আবার যেখানে পড়ুয়ার সংখ্যা রয়েছে, সেখানে শিক্ষক ঘাটতি কেন?
যদিও এই পরিসংখ্যানের ব্যাখ্যায় ভিন্ন যুক্তি দিয়েছে রাজ্য সরকার। স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মণ-এর দাবি, পড়ুয়াশূন্য স্কুলের সংখ্যার একটা বড় অংশের ক্ষেত্রে তথ্য আপলোডের গাফিলতি রয়েছে। বহু বেসরকারি স্কুল কেন্দ্রীয় পোর্টালে শিক্ষকদের তথ্য আপলোড করলেও পড়ুয়াদের তথ্য যথাযথ ভাবে আপলোড করেনি। ফলে ইউডিআইএসই প্লাস তথ্যভাণ্ডারে সংশ্লিষ্ট স্কুলগুলিতে পড়ুয়ার সংখ্যা ‘শূন্য’ দেখাচ্ছে।
তবে সমস্যা যে শুধুমাত্র তথ্যগত ত্রুটিতে সীমাবদ্ধ নয়, রিপোর্টের অন্য পরিসংখ্যানেই তার ইঙ্গিত স্পষ্ট। রাজ্যের মোট ৯৩,১৪৭টি স্কুলের প্রায় ৮ শতাংশে পড়ুয়ার সংখ্যা ১০ জনেরও কম। বিপরীতে প্রায় ৮.৫ শতাংশ স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা ৫০০-র বেশি। অর্থাৎ একই রাজ্যে কোথাও শ্রেণিকক্ষ কার্যত পড়ুয়াশূন্য, আবার কোথাও একজন শিক্ষকের উপরেই বিপুল সংখ্যক পড়ুয়ার শিক্ষাদানের দায় বর্তাচ্ছে।
শিক্ষক-পড়ুয়া অনুপাতেও পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান উদ্বেগজনক। রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজ্যে শিক্ষক-পড়ুয়া অনুপাত ৩০, যা দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। পরিকাঠামোর ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। রাজ্যের ৯৩,১৪৭টি স্কুলের মধ্যে মাত্র ২৩,৮৯৪টি স্কুলে কম্পিউটার এবং ১৮,৩৭৪টি স্কুলে ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে।
এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে শিক্ষক নিয়োগের দীর্ঘস্থায়ী সঙ্কটের কথাও উঠে এসেছে। স্কুলশিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, গত ১৫ বছরে কার্যত কোনও শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ এবং পরবর্তী আইনি জটিলতার জেরে শিক্ষা ব্যবস্থায় যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি সরকারের।
শিক্ষক বণ্টনের ভারসাম্য ফেরাতে ইতিমধ্যেই ‘র‍্যাশনালাইজেশন’-এর পথে হাঁটার কথা জানিয়েছে রাজ্য। যে সব স্কুলে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত শিক্ষক রয়েছেন, সেখান থেকে শিক্ষক বদলি করে শিক্ষকহীন বা এক-শিক্ষক বিশিষ্ট স্কুলে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। চলতি বছরের শেষের মধ্যে পরিস্থিতির বড় অংশের পরিবর্তন হবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।
তবে অতীতের ক্যাগ রিপোর্টও রাজ্যের স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থার শিক্ষক-সঙ্কট ও অসামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। সেখানে ৫২০টি স্কুলে কোনও শিক্ষক না থাকা সত্ত্বেও ৮,৫৯৬ জন পড়ুয়ার উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। উচ্চ প্রাথমিকের পর ২৮ থেকে ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থী স্কুলছুট হওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছিল। ফলে ইউডিআইএসই প্লাস রিপোর্টের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান নতুন করে সামনে আনল বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থার এক গভীর বৈপরীত্য—কোথাও পড়ুয়া নেই, অথচ শিক্ষক রয়েছেন হাজারে হাজারে; আবার কোথাও একজন শিক্ষককেই সামলাতে হচ্ছে হাজারো পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ। তথ্যের গরমিল দ্রুত সংশোধন এবং শিক্ষক নিয়োগ ও বণ্টনে স্থায়ী ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা না গেলে এই বৈষম্যের অভিঘাত যে সরাসরি পড়ুয়াদের ভবিষ্যতের উপর পড়বে, তা নিয়ে সংশয় নেই।