নেপালে ভয়াবহ হড়পা বানের পর কেটে গিয়েছে এক সপ্তাহ। বিপর্যয়ে প্রাণহানি ও ধ্বংসের পাশাপাশি সামনে এসেছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এত বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর বিপুল আর্থিক ক্ষতি কী ভাবে সামাল দেবে একটি দেশ? সেই সূত্রেই আলোচনায় এসেছে ‘ডিজাস্টার ইনশিওরেন্স’ বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়জনিত আর্থিক ক্ষতির বিমা।
নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের পর পুনর্গঠন ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিকাঠামো ফের তৈরি করতে প্রায় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছে। ভারতীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৩৮ হাজার কোটি থেকে ৪৮ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল ব্যয় নেপালের অর্থনীতির উপরও বড় চাপ তৈরি করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে আগে থেকেই উপযুক্ত বিমা সুরক্ষা থাকলে বিপর্যয়ের পর পুনর্গঠনের আর্থিক চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা এবং তার আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে। সুইস রে ইনস্টিটিউটের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। এর একটি অংশ বিমার আওতায় থাকলেও বহু দেশ এখনও পর্যাপ্ত বিমা সুরক্ষার বাইরে। ফলে দুর্যোগের পর পুনর্গঠনের দায়িত্ব সরাসরি সরকার ও সাধারণ মানুষের উপর এসে পড়ে।
ভারতের পরিস্থিতিও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। সোশ্যাল পলিসি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের একটি গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে হওয়া মোট আর্থিক ক্ষতির মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ বিমার আওতায় আসে। ফলে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিধস, খরা কিংবা অতিবৃষ্টির মতো দুর্যোগের পরে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, কৃষক এবং ব্যবসার উপর বিপুল আর্থিক চাপ তৈরি হয়। এই কারণেই দেশে জাতীয় স্তরে দুর্যোগ বিমা প্রকল্প চালুর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে।
এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের নজরে রয়েছে ‘প্যারামেট্রিক ইনশিওরেন্স’। প্রচলিত বিমায় সাধারণত বিপর্যয়ের পর ক্ষয়ক্ষতি পরিমাপ করে তার ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। কিন্তু প্যারামেট্রিক বিমায় ক্ষয়ক্ষতির হিসাবের পরিবর্তে আগে থেকেই নির্ধারিত কোনও নির্দিষ্ট সূচক বা সীমা অতিক্রম করলেই বিমার টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে।
উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারে, কোনও এলাকায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বৃষ্টিপাত একটি নির্ধারিত মাত্রা অতিক্রম করল, অথবা ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ নির্দিষ্ট সীমায় পৌঁছল—তাহলে চুক্তিতে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। ফলে ক্ষয়ক্ষতির দীর্ঘ প্রক্রিয়াগত মূল্যায়নের জন্য অপেক্ষা না করেই দ্রুত আর্থিক সহায়তা পাওয়া সম্ভব।
বড় আন্তর্জাতিক বিমা ও পুনর্বিমা সংস্থাগুলি এই ধরনের বিমা পরিষেবা দিয়ে থাকে। সুইস রে, মিউনিখ রে, এএক্সএ ক্লাইমেট এবং অ্যালিয়ানৎসের মতো সংস্থাগুলি বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ুজনিত ঝুঁকির জন্য প্যারামেট্রিক বিমা নিয়ে কাজ করছে। কৃত্রিম উপগ্রহ, আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্য, সেন্সর এবং অন্যান্য প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট সূচক পর্যবেক্ষণ করে বিমার অর্থ দ্রুত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
ভারতেও এই ধরনের বিমার কিছু ব্যবহার রয়েছে। বাজাজ অ্যালিয়ানৎস, গো ডিজিট এবং ফিউচার জেনেরালির মতো বিমা সংস্থাগুলি বিভিন্ন ধরনের প্যারামেট্রিক বা আবহাওয়াভিত্তিক বিমা পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত। কৃষিক্ষেত্রে ওয়েদার বেসড ক্রপ ইনশিওরেন্স স্কিমের মতো ব্যবস্থাতেও নির্দিষ্ট আবহাওয়া-সূচকের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণের কাঠামো রয়েছে।
কেবল ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেই নয়, সরকারও এই ধরনের বিমার প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারে। কোনও রাজ্য বা দেশের সরকার বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পরে দ্রুত আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করার জন্য প্যারামেট্রিক বিমার আওতায় আসতে পারে।
ভারতের নাগাল্যান্ডে এমন একটি উদ্যোগের উদাহরণ রয়েছে। নাগাল্যান্ড স্টেট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি এসবিআই জেনারেল ইনশিওরেন্সের সঙ্গে ডিজাস্টার রিস্ক ট্রান্সফার প্যারামেট্রিক ইনশিওরেন্স সলিউশন বা ডিআরটিপিএস নামে একটি চুক্তি করেছে। ২০২৪ সালে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তির মেয়াদ ২০২৪ থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত। এই ধরনের উদ্যোগ দেখাচ্ছে, দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধুমাত্র সরকারি ত্রাণের উপর নির্ভর না করে আগাম আর্থিক ঝুঁকি স্থানান্তরের ব্যবস্থাও করা সম্ভব।
ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও প্যারামেট্রিক বিমা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কৃষি খামার, সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প, পর্যটন ব্যবসা কিংবা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ প্রতিষ্ঠান এই ধরনের বিমার আওতায় আসতে পারে। নেপালের আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও প্যারামেট্রিক বিমার আওতায় রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই ব্যবস্থা বড় আকারে চালু করার ক্ষেত্রে অন্যতম সমস্যা হল দীর্ঘমেয়াদি অর্থের জোগান এবং প্রিমিয়ামের খরচ। বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলিতে সরকার, বিমা সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় না হলে বৃহৎ পরিসরে এই ধরনের বিমা চালু করা কঠিন।
নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় তাই শুধু উদ্ধার ও পুনর্বাসনের প্রশ্নই সামনে আনেনি, জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে আর্থিক ঝুঁকি কী ভাবে সামলানো হবে, সেই প্রশ্নও নতুন করে তুলেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব না হলেও আগাম সতর্কতা, উন্নত নজরদারি এবং কার্যকর বিমা ব্যবস্থার মাধ্যমে বিপর্যয়ের পর মানুষের জীবন ও অর্থনীতির উপর চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
নতুন গতি 
























