নিজস্ব সংবাদদাতা: মহানগরীর নিরেট কংক্রিটের বুকে ক্ষুধার্ত শিশুর জন্য স্টোভ জ্বালিয়ে প্রকাশ্য রাজপথে লাঞ্ছিত হওয়া—পার্ক স্ট্রিটের সেই ফুটপাতবাসী নারীর অবমাননার জল শেষ পর্যন্ত গড়াল প্রশাসনিক শীর্ষ কাঠামোর দ্বারে। পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের তীব্র ভর্ৎসনার মুখে পড়ে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসা সেই দুর্ভাগা সীতাদেবী কোলে ক্রন্দনরত সন্তানকে নিয়ে মঙ্গলবার সল্টলেকে আয়োজিত ‘জনতার দরবারে’ সশরীরে উপস্থিত হলেন। বরানগরের বিধায়ক সজল ঘোষের মধ্যস্থতায় সল্টলেকে বিজেপির দলীয় কার্যালয়ে মুখ্যমন্ত্রীর মুখোমুখি হয় ওই পরিবার। ফুটপাতের চরম অনিশ্চয়তা ও মানবেতর অস্তিত্ব ঘুচিয়ে পরিবারটিকে স্থায়ী বাসস্থানের বন্দোবস্ত করার দ্ব্যর্থহীন আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একই সঙ্গে এই মানবিক সংকটকে পুঁজি করে বিরোধীদের নোংরা রাজনীতির বিরুদ্ধেও তীব্র তোপ দেগেছেন তিনি।
কয়েকদিন আগে পার্ক স্ট্রিটের ফুটপাতে বসে নিজের নাতির ক্ষুধা নিবৃত্তির তাগিদে স্টোভে দুধ গরম করছিলেন সীতাদেবী নামের এক প্রবীণ ফুটপাতবাসী। সে সময় পথ পরিদর্শনে গিয়ে প্রকাশ্য রাস্তায় মেজাজ হারিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। ফুটপাতে আগুন জ্বালানোকে বিপজ্জনক আখ্যা দিয়ে তিনি চিৎকার করেন ও ফুটপাত খালি করার নির্দেশ দেন। সেই ঘটনার ভিডিও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই সমালোচনার ঝড় ওঠে এবং প্রশাসনিক সংবেদনশীলতার অবক্ষয় নিয়ে সরব হয় নাগরিক সমাজ। মানবিকতার প্রশ্নে আসরে নামেন বেলেঘাটার তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ এবং ফেসবুক বার্তায় তীব্র নিন্দা জানান প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সমাজমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করে অগ্নিমিত্রা স্বীকার করেন যে পথচারীদের নিরাপত্তার স্বার্থে কথা বললেও চিৎকার না করে আরও সংযত ভাষায় বোঝানো উচিত ছিল।
এই টানাপোড়েনের মাঝেই মঙ্গলবার সল্টলেকে জনতার দরবার শেষে সীতাদেবীর ক্ষতে প্রলেপ দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেন, “ফুটপাত পথচারীদের চলাচলের জন্য, পরিবার নিয়ে রাত কাটানোর জায়গা নয়। কলকাতা পুরসভাকে নির্দেশ দিয়ে ওনাদের স্থায়ী বাসস্থানের বন্দোবস্ত করে দেওয়া হবে। ওনাদের আর রাস্তায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হবে না।”
সাক্ষাৎ শেষে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বিরোধীদের তীব্র রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। শুভেন্দুর দাবি, তৃণমূলনেত্রী তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে অর্থ পাঠিয়ে ওই অসহায় মহিলাকে সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খোলার প্রলোভন দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু সীতাদেবী সেই চক্রান্তে পা না দিয়ে প্রশাসনের প্রতিই আস্থা প্রকাশ করেছেন।
পূর্বতন শাসনকালের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে শুভেন্দু বলেন, “৩৪ বছরের বাম শাসন আর ১৫ বছরের তৃণমূল জমানা—বিগত প্রায় পঞ্চাশ বছরে এই নিঃস্ব মানুষগুলোর স্থায়ী পুনর্বাসনের ন্যূনতম দায় কেউ নেয়নি। অথচ আজ তাঁরা ছড়া আর কবিতার আড়ালে মেকি সহানুভূতি দেখাচ্ছেন।”
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবারটিকে আশ্রয় দেওয়ার প্রস্তাবকে সরাসরি কটাক্ষ করে তিনি পাল্টা প্রশ্ন তোলেন, “যদি আন্তরিকতাই থাকে, তবে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ওই পরিবারকে নিজের কালীঘাটের বাসভবনে ঠাঁই দিচ্ছেন না কেন?” ফুটপাতে দুধের পাত্র হাতে পথচলতি লাঞ্ছনা সহ্য করা এক সর্বহারা নারীর কান্না শেষ পর্যন্ত স্থায়ী নাগরিক আশ্রয়ের আলো দেখতে চলেছে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক তরজার মাঝেও নজর রাখছে আপামর শহরবাসী।
নতুন গতি 





























