নতুন গতি, নয়াদিল্লি: পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়া এবং নাম খারিজকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া একগুচ্ছ মামলায় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করল দেশের শীর্ষ আদালত। ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার পাহাড় এবং শ্লথগতির নিষ্পত্তির প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার জাতীয় নির্বাচন কমিশনের কাছে পূর্ণাঙ্গ হিসাব তলব করেছে সুপ্রিম কোর্ট। একই সঙ্গে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সাংবিধানিক পর্যবেক্ষণ দিয়ে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার অর্থই কোনও ব্যক্তির নাগরিকত্ব খারিজ হয়ে যাওয়া নয়। ফলে কেবল এই যুক্তিতে কাউকে অন্নপূর্ণা যোজনা, রেশন বা অন্যান্য সরকারি জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা থেকে কিছুতেই বঞ্চিত করা যাবে না।
মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনের বেঞ্চে প্রদেশ কংগ্রেস নেতা অধীররঞ্জন চৌধুরী, প্রদেশ কংগ্রেসের এসআইআর সেলের চেয়ারম্যান প্রসেনজিৎ বসু এবং মইদুল মোল্লাদের দায়ের করা পৃথক তিনটি জনস্বার্থ মামলার একত্র শুনানি হয়। শুনানিতে ট্রাইব্যুনালের আবেদন সংক্রান্ত এক বিস্ফোরক পরিসংখ্যান তুলে ধরেন মামলাকারীদের আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণন। শীর্ষ আদালতকে জানানো হয়, এসআইআর প্রক্রিয়ার পর রাজ্যে মোট ৩৮ লক্ষ আপিল জমা পড়েছে। তার মধ্যে প্রায় ৩১ লক্ষ আবেদনই (যা মোট আবেদনের প্রায় ৮০ শতাংশ) ভোটার তালিকা থেকে অপরের নাম বাদ দেওয়ার বা নাম অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে করা হয়েছে। অপর দিকে, এসআইআরের জেরে ভোটার তালিকা থেকে নাম ছাঁটাই হওয়ার পর তা পুনর্বহালের আর্জি জানিয়েছেন মাত্র ৭ লক্ষ প্রকৃত ভোটার।
আইনজীবীরা আদালতে জানান, বাদ পড়া ভোটারদের দায়ের করা আপিলগুলির মধ্যে এখনও পর্যন্ত মাত্র ৮৩ হাজার আবেদনের নিষ্পত্তি হয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ৭৫ হাজার আবেদনকারীই তাঁদের নাম ভোটার তালিকায় পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করতে সফল হয়েছেন। অর্থাৎ নিষ্পত্তি হওয়া মামলার প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই রায় গিয়েছে সাধারণ ভোটারের পক্ষে। এই তথ্য শুনে তীব্র বিস্ময় প্রকাশ করে ডিভিশন বেঞ্চ। সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয়, কতগুলি আবেদন নাম অন্তর্ভুক্তির আর কতগুলি নাম বাদ দেওয়ার—তার পৃথক শ্রেণিবিন্যাস করে হলফনামা দিতে হবে কমিশনকে। কত আবেদন এখনও বিচারাধীন, কতগুলি নিষ্পত্তি হয়েছে এবং কতজনের নাম নতুন করে তালিকায় যুক্ত হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ খতিয়ান দ্রুত আদালতে পেশ করতে হবে।
মামলাকারী কংগ্রেস নেতা অধীররঞ্জন চৌধুরী আদালতে অভিযোগ তোলেন, কমিশনের খামখেয়ালিপনার জেরে প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষ ভোটদানের সাংবিধানিক অধিকার হারিয়েছেন। ট্রাইব্যুনালের কাজের যে গতি, তাতে সমস্ত আবেদন নিষ্পত্তি হতে চার থেকে পাঁচ বছর সময় লেগে যাবে। অধীরবাবুর পক্ষ থেকে আবেদন জানানো হয়, বিপুল মামলার চাপ সামাল দিতে আরও অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি নিয়োগ করা হোক এবং বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ ও মালদহের মতো সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে অবিলম্বে ব্লকভিত্তিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হোক।মামলাকারীদের অভিযোগ, বহু সাধারণ মানুষ সচেতনতার অভাবে সরাসরি অফলাইনে কাগজে-কলমে আবেদন করেছিলেন, কিন্তু সেগুলি আদৌ পোর্টালে নথিভুক্ত হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। সেই কারণে ট্রাইব্যুনালে আবেদনের সময়সীমা বৃদ্ধি এবং একটি স্বচ্ছ অনলাইন ট্র্যাকিং পোর্টাল তৈরির দাবিও ওঠে।
এর পাশাপাশি ডেরেক ও’ব্রায়েন, দোলা সেনদের দায়ের করা মূল এসআইআর মামলা এবং তৃণমূলের টিকিট জিতে অন্য দলে যাওয়া ২০ জন ‘বিদ্রোহী’ সাংসদের পদ খারিজ সংক্রান্ত তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দায়ের করা মামলার শুনানিও বেঞ্চে ওঠে। সব মিলিয়ে এসআইআর এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় সুপ্রিম কোর্টের এই কড়া অবস্থান জাতীয় নির্বাচন কমিশন এবং রাজ্য প্রশাসনের উপর আইনি চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিল। এখন নজর কমিশনের পরবর্তী হলফনামার দিকে।
নতুন গতি 





























