১৩ জুন ২০২৬, শনিবার, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
১৩ জুন ২০২৬, শনিবার, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ভারতে কমছে জন্মহার, প্রবীণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির শঙ্কা

শান্তি রায়চৌধুরী: ভারতের জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতিতে এক ঐতিহাসিক মোড় এসেছে। দেশটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সামগ্রিক জন্মহার বা টোটাল ফার্টিলিটি রেট (টিএফআর) জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সূচকের চেয়ে নিচে নেমে গেছে।

সরকারের সাম্প্রতিক ‘স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম’ (এসআরএস) পরিসংখ্যান প্রতিবেদনে উঠে আসে, ভারতে প্রতি মহিলার গড় সন্তান জন্মদানের হার এখন ১.৯, যা দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যা ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সূচক ২.১-এর চেয়ে কম। ২০০০ সালের দিকেও এই হার ছিল ৩.৩। জন্মহারের এই নাটকীয় পতন ভবিষ্যতে তীব্র শ্রমশক্তি ঘাটতি ও প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধির মতো বড় অর্থনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

উন্নয়ন অর্থনীতিবিদদের মতে, মহিলাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি, আধুনিক গর্ভনিরোধক ব্যবস্থার সহজলভ্যতা এবং পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে মহিলাদের স্বাধীনতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে জন্মহার দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। পাশাপাশি বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সন্তান লালন-পালনের খরচ বেড়ে যাওয়াও একটি বড় কারণ। এছাড়া দেশে শিশু মৃত্যুর হার ২০১৯ সালের প্রতি হাজারে ৩০ জন থেকে কমে ২০২৪ সালে ২৪ জনে নেমে এসেছে। শিশু মৃত্যুর এই হ্রাসও দম্পতিদের বেশি সন্তান নেওয়ার প্রবণতা কমিয়ে দিয়েছে।

তবে এই জন্মহারের পতন পুরো ভারতজুড়ে সমান নয়, যার ফলে তীব্র আঞ্চলিক বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে পিছিয়ে থাকা বিহার ও উত্তরপ্রদেশের মতো দরিদ্র উত্তর ভারতীয় রাজ্যগুলোতে জন্মহার যথাক্রমে ২.৯ এবং ২.৬, যা বেশ উচ্চ। অন্যদিকে, উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অধিকারী দিল্লির জন্মহার মাত্র ১.২ এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়ু ও কেরালায় এই হার ১.৩। এই তারতম্যের কারণে ভারতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জনসংখ্যার এই ভারসাম্যহীনতা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় সংকট তৈরি করতে পারে। ২০২৬ সালের পরবর্তী সময়ে নতুন আদমশুমারির ওপর ভিত্তি করে ভারতের লোকসভার আসন বিন্যাস বা ‘ডিলিমিটেশন’ হওয়ার কথা রয়েছে। জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় উত্তর ভারতের রাজ্যগুলো সংসদে অধিক আসন পেয়ে রাজনৈতিকভাবে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে, যা জন্মহার নিয়ন্ত্রণে সফল হওয়া দক্ষিণের রাজ্যগুলোকে ক্ষুব্ধ করছে। তারা মনে করছে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে তারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে উল্টো শাস্তির মুখোমুখি হচ্ছে।

একই সঙ্গে এই জনসংখ্যা সংক্রান্ত তথ্য ভারতের ধর্মীয় রাজনীতির একটি প্রচলিত ধারণাকেও খণ্ডন করেছে। ভারতের হিন্দু ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিল যে মুসলিমদের জন্মহার হিন্দুদের চেয়ে বেশি এবং তারা একসময় সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে উঠবে। কিন্তু সরকারি তথ্য বলছে, গত তিন দশকে ভারতে অন্য যেকোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর চেয়ে মুসলিমদের জন্মহার সবচেয়ে দ্রুত গতিতে হ্রাস পেয়েছে।

১৯৯২ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে মুসলিমদের জন্মহার ৪.৪১ থেকে কমে ২.৩৬-এ দাঁড়িয়েছে, অন্যদিকে হিন্দুদের ক্ষেত্রে তা ৩.৩ থেকে কমে ১.৯৪ হয়েছে। বর্তমান জরিপ স্পষ্ট করছে যে সব ধর্ম নির্বিশেষে ভারতের সামগ্রিক জন্মহার নিম্নমুখী।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে জন্মহার এভাবে কমতে থাকলে আগামী ৩০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে ভারত একটি প্রবীণ সমাজে পরিণত হবে, যা উৎপাদনশীল শ্রমশক্তি কমিয়ে দেবে এবং রাষ্ট্রের ওপর স্বাস্থ্য ও পেনশনের বোঝা বাড়াবে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় স্তরে এখনো বড় কোনো নীতি ঘোষণা করা না হলেও দক্ষিণের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য ইতোমধ্যে তৃতীয় ও চতুর্থ সন্তান জন্মদানের জন্য আর্থিক অনুদানের ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া গোয়া, কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানার মতো রাজ্যগুলো প্রথমবার মা-বাবা হতে যাওয়া দম্পতিদের উৎসাহিত করতে সরকারি অর্থায়নে আইভিএফ সেন্টার চালু করেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জন্মহার বাড়াতে জোর করার চেয়ে সরকারের উচিত ভবিষ্যৎ প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও পেনশনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পলিসি তৈরি করা।

অস্ট্রেলিয়ান ওপেন: সেমিফাইনালে উঠলেন সিন্ধু, কোয়ার্টার ফাইনালে ইয়ামাগুচির কাছে হারলেন তানভি

নতুন গতি © All rights reserved.| Developed by eTech Builder

ভারতে কমছে জন্মহার, প্রবীণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির শঙ্কা

আপডেট : ১২ জুন ২০২৬, শুক্রবার

শান্তি রায়চৌধুরী: ভারতের জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতিতে এক ঐতিহাসিক মোড় এসেছে। দেশটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সামগ্রিক জন্মহার বা টোটাল ফার্টিলিটি রেট (টিএফআর) জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সূচকের চেয়ে নিচে নেমে গেছে।

সরকারের সাম্প্রতিক ‘স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম’ (এসআরএস) পরিসংখ্যান প্রতিবেদনে উঠে আসে, ভারতে প্রতি মহিলার গড় সন্তান জন্মদানের হার এখন ১.৯, যা দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যা ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সূচক ২.১-এর চেয়ে কম। ২০০০ সালের দিকেও এই হার ছিল ৩.৩। জন্মহারের এই নাটকীয় পতন ভবিষ্যতে তীব্র শ্রমশক্তি ঘাটতি ও প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধির মতো বড় অর্থনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

উন্নয়ন অর্থনীতিবিদদের মতে, মহিলাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি, আধুনিক গর্ভনিরোধক ব্যবস্থার সহজলভ্যতা এবং পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে মহিলাদের স্বাধীনতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে জন্মহার দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। পাশাপাশি বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সন্তান লালন-পালনের খরচ বেড়ে যাওয়াও একটি বড় কারণ। এছাড়া দেশে শিশু মৃত্যুর হার ২০১৯ সালের প্রতি হাজারে ৩০ জন থেকে কমে ২০২৪ সালে ২৪ জনে নেমে এসেছে। শিশু মৃত্যুর এই হ্রাসও দম্পতিদের বেশি সন্তান নেওয়ার প্রবণতা কমিয়ে দিয়েছে।

তবে এই জন্মহারের পতন পুরো ভারতজুড়ে সমান নয়, যার ফলে তীব্র আঞ্চলিক বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে পিছিয়ে থাকা বিহার ও উত্তরপ্রদেশের মতো দরিদ্র উত্তর ভারতীয় রাজ্যগুলোতে জন্মহার যথাক্রমে ২.৯ এবং ২.৬, যা বেশ উচ্চ। অন্যদিকে, উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অধিকারী দিল্লির জন্মহার মাত্র ১.২ এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়ু ও কেরালায় এই হার ১.৩। এই তারতম্যের কারণে ভারতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জনসংখ্যার এই ভারসাম্যহীনতা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় সংকট তৈরি করতে পারে। ২০২৬ সালের পরবর্তী সময়ে নতুন আদমশুমারির ওপর ভিত্তি করে ভারতের লোকসভার আসন বিন্যাস বা ‘ডিলিমিটেশন’ হওয়ার কথা রয়েছে। জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় উত্তর ভারতের রাজ্যগুলো সংসদে অধিক আসন পেয়ে রাজনৈতিকভাবে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে, যা জন্মহার নিয়ন্ত্রণে সফল হওয়া দক্ষিণের রাজ্যগুলোকে ক্ষুব্ধ করছে। তারা মনে করছে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে তারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে উল্টো শাস্তির মুখোমুখি হচ্ছে।

একই সঙ্গে এই জনসংখ্যা সংক্রান্ত তথ্য ভারতের ধর্মীয় রাজনীতির একটি প্রচলিত ধারণাকেও খণ্ডন করেছে। ভারতের হিন্দু ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিল যে মুসলিমদের জন্মহার হিন্দুদের চেয়ে বেশি এবং তারা একসময় সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে উঠবে। কিন্তু সরকারি তথ্য বলছে, গত তিন দশকে ভারতে অন্য যেকোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর চেয়ে মুসলিমদের জন্মহার সবচেয়ে দ্রুত গতিতে হ্রাস পেয়েছে।

১৯৯২ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে মুসলিমদের জন্মহার ৪.৪১ থেকে কমে ২.৩৬-এ দাঁড়িয়েছে, অন্যদিকে হিন্দুদের ক্ষেত্রে তা ৩.৩ থেকে কমে ১.৯৪ হয়েছে। বর্তমান জরিপ স্পষ্ট করছে যে সব ধর্ম নির্বিশেষে ভারতের সামগ্রিক জন্মহার নিম্নমুখী।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে জন্মহার এভাবে কমতে থাকলে আগামী ৩০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে ভারত একটি প্রবীণ সমাজে পরিণত হবে, যা উৎপাদনশীল শ্রমশক্তি কমিয়ে দেবে এবং রাষ্ট্রের ওপর স্বাস্থ্য ও পেনশনের বোঝা বাড়াবে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় স্তরে এখনো বড় কোনো নীতি ঘোষণা করা না হলেও দক্ষিণের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য ইতোমধ্যে তৃতীয় ও চতুর্থ সন্তান জন্মদানের জন্য আর্থিক অনুদানের ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া গোয়া, কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানার মতো রাজ্যগুলো প্রথমবার মা-বাবা হতে যাওয়া দম্পতিদের উৎসাহিত করতে সরকারি অর্থায়নে আইভিএফ সেন্টার চালু করেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জন্মহার বাড়াতে জোর করার চেয়ে সরকারের উচিত ভবিষ্যৎ প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও পেনশনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পলিসি তৈরি করা।