নিজস্ব সংবাদদাতা: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বুধবার রাতের তাণ্ডবের তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে একের পর এক বিস্ফোরক প্রশ্ন। বহিরাগতেরা কী ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কড়া নিরাপত্তা পেরিয়ে ক্যাম্পাসে ঢুকল, গেটের তালা কে খুলেছিল, নিরাপত্তারক্ষীদের ভূমিকা কী ছিল—এই প্রশ্নের পাশাপাশি এ বার সিসিটিভি ফুটেজে প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য তথা গণিত বিভাগের অধ্যাপক বুদ্ধদেব সাউয়ের উপস্থিতি ঘিরেও তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, বহিরাগতদের ক্যাম্পাসে প্রবেশের পর ৪ নম্বর গেটের কাছে উপস্থিত ছিলেন বুদ্ধদেব। তাঁর পাশেই ছিলেন এবিভিপির কেন্দ্রীয় কমিটির এক সদস্য। ফলে সংঘর্ষের রাতে ভিতর থেকে কোনও প্ররোচনা বা সহায়তা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে শিক্ষকদের একাংশের মধ্যে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। যদিও বুদ্ধদেবের দাবি, তিনি পরিস্থিতি শান্ত করতে এবং পড়ুয়াদের রক্ষা করতেই ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে ৪ নম্বর গেটের নিরাপত্তা নিয়ে। কর্তৃপক্ষের হাতে থাকা সিসিটিভি ফুটেজে, যা পুলিশের কাছেও তুলে দেওয়ার কথা, দেখা যাচ্ছে—বহিরাগতদের ঢোকার কয়েক মুহূর্ত আগে এক নিরাপত্তারক্ষী গেটের তালার কাছে কিছু করছেন। এর পরেই রাত প্রায় ১২টা ৩৮ মিনিটে একদল বহিরাগত ক্যাম্পাসে ঢুকে পড়ে। ফুটেজে তাঁদের তালা ভেঙে ঢুকতে দেখা যাচ্ছে না। বরং গেটের সামনে থাকা নিরাপত্তারক্ষীদের কাছ থেকে বাধার দৃশ্যও স্পষ্ট নয় বলে দাবি করা হচ্ছে। পাশের একটি ছোট গেটও খোলা ছিল বলে ফুটেজে দেখা গিয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থার ভিতরেই কি কোনও ফাঁক তৈরি করা হয়েছিল, নাকি গাফিলতির সুযোগ নিয়েই বহিরাগতেরা ঢুকে পড়েছিল—তার উত্তর এখন তদন্তের অপেক্ষায়।
এই সময়েই সামনে এসেছে বুদ্ধদেব সাউয়ের উপস্থিতি। ফুটেজ অনুযায়ী, রাত প্রায় ১২টা ৪০ মিনিটে বহিরাগতদের একটি অংশের পিছু পিছু ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য। ৪ নম্বর গেটের কাছে তাঁকে বেশ কিছুক্ষণ কয়েকজনের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখা যায়। পরে বহিরাগতদের একটি অংশ ক্যাম্পাস ছাড়ার পর তাঁকেও বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। এই দৃশ্য ঘিরেই শিক্ষকদের একাংশের প্রশ্ন—বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন চত্বরে থাকা একজন অধ্যাপক হিসেবে তিনি ঘটনাস্থলে কেন গেলেন, এবং বহিরাগতদের সঙ্গে তাঁর সেখানে অবস্থানের প্রকৃত কারণ কী?
অবশ্য বুদ্ধদেব সাউ নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, কর্মীদের কাছ থেকে গোলমালের খবর পেয়েই তিনি ঘটনাস্থলে যান। তাঁর দাবি, ছাত্ররা মার খেয়েছে জানতে পেরে সংগঠনের তরফে তাঁকে সেখানে যেতে বলা হয়েছিল। তিনি কাউকে উস্কানি দেননি; বরং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেছেন। তাঁর পাল্টা অভিযোগ, তাঁকে ঘিরে ‘মিথ্যে ন্যারেটিভ’ তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষকদের একাংশ সেই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন। জুটার সভাপতি পার্থপ্রতিম রায় জানিয়েছেন, প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত উপাচার্যের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠা অত্যন্ত গুরুতর। তাঁর দাবি, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন এবং সত্যিই তিনি ঘটনাস্থলে থেকে কোনও ভূমিকা পালন করে থাকলে তাঁকেও তদন্তের আওতায় আনতে হবে। প্রয়োজন হলে পুলিশি তদন্তের দাবিও উঠছে।
এদিকে বুধবার রাতের ঘটনার প্রায় ৩৭ ঘণ্টা পরে যাদবপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য। অজ্ঞাতপরিচয় বহিরাগতদের বিরুদ্ধে বেআইনি জমায়েত, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে সম্পত্তির ক্ষতি, ভয় দেখানো এবং জোর করে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে প্রবেশের মতো অভিযোগে মামলা রুজু হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। বৃহস্পতিবারের এবিভিপি ও বামেদের অনুমতিহীন জমায়েত নিয়েও পৃথক মামলা হয়েছে।
ঘটনার তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠন করেছে। একই সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজ পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। ফলে এখন তদন্তের কেন্দ্রে শুধু বহিরাগতদের পরিচয় নয়—তাঁরা কী ভাবে ক্যাম্পাসে ঢুকল, নিরাপত্তারক্ষীদের ভূমিকা কী ছিল, গেটের তালা কী ভাবে খোলা হল এবং ঘটনার আগে-পরে কারা তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগে ছিলেন—এই প্রশ্নগুলিও উঠে আসছে।
যাদবপুরের চার নম্বর গেটে ভেঙে যাওয়া নন্দলাল বসুর নকশা করা ঐতিহ্যবাহী এমব্লেমও ইতিমধ্যে সংস্কার করে পুনঃস্থাপন করা হয়েছে। ঘটনার প্রতিবাদে শিক্ষক, পড়ুয়া ও প্রাক্তনীদের একাংশ অর্ধদিবস কর্মবিরতি ও বিক্ষোভে সামিল হয়েছেন।
এখন আর প্রশ্ন শুধু ‘কে হামলা করল’ নয়—বহিরাগতেরা যদি সত্যিই বেআইনিভাবে ঢুকে থাকে, তবে তাঁদের প্রবেশের পথ খুলে দিল কে? নিরাপত্তাব্যবস্থার কোথায় ভাঙন তৈরি হয়েছিল? আর ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যেকের ভূমিকা কি একই নিরপেক্ষতায় খতিয়ে দেখা হবে? সিসিটিভি ফুটেজ সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে। তবে অভিযোগকে সত্য বলে ধরে নেওয়া নয়, ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য ও তদন্তের তথ্য মিলিয়েই প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করা এখন বিশ্ববিদ্যালয় ও পুলিশের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
নতুন গতি 


















