২৫ অগাস্ট ২০২৬, মঙ্গলবার, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩
২৫ অগাস্ট ২০২৬, মঙ্গলবার, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩

শিশুর দুধের আগুনে ক্ষমতার আস্ফালন : ফুটপাতে প্রতিধ্বনিত পুরমন্ত্রীর অসংবেদনশীল রূপ

ইমামা খাতুন, কলকাতা:  নগরায়ণ ও সৌন্দর্যায়নের মোড়কে ক্ষমতার চরম ঔদ্ধত্য যখন এক অসহায় ফুটপাতবাসীর উনুনকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়, তখন প্রশাসনের তথাকথিত ‘জনকল্যাণমুখী’ মুখোশটি খসে পড়ে। পার্ক স্ট্রিট সংলগ্ন ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ফুটপাতে ছ’মাসের একরত্তি শিশুর জন্য কেরোসিনের স্টোভে দুধ গরম করার অপরাধে এক বৃদ্ধা ও মায়ের উপর রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের রুদ্ররোষ প্রদর্শনের ঘটনায় তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওচিত্রে মন্ত্রীর কর্কশ কণ্ঠস্বর, ধমক এবং ক্ষমতার প্রদর্শন ঘিরে জনমানসে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। নাগরিক সমাজের স্পষ্ট অভিযোগ—শহর দখলমুক্ত করার নামে এক চরম অমানবিক ও সংবেদনহীন আচরণের নজির গড়লেন নবনিযুক্ত মন্ত্রী।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে শনিবারের একটি দৃশ্য। দেখা যায়, ফুটপাতের প্রান্তে স্টোভ জ্বালিয়ে শিশুর ক্ষুধা নিবারণের চেষ্টা করছিলেন পরিবারের সদস্যরা। সেই সময় পরিদর্শনে গিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন পুরমন্ত্রী। রাস্তার উপরে কেন এমন ‘সংসার’ পাতা হয়েছে, সেই প্রশ্নে অগ্নিশর্মা হয়ে তিনি জিনিসপত্র সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। অভিযোগ ওঠে, দুধের পাত্র ফেলে দেওয়ার উপক্রম হয়। বিরোধীদের তরফে তীব্র ভর্ৎসনা ধেয়ে আসতেই সোমবার সামাজিক মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থনে ভিডিও বার্তা দেন মন্ত্রী। তাঁর দাবি, কোনও শিশুর মুখের খাদ্য কেড়ে নেওয়া হয়নি। ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের মতো ব্যস্ত ও বিপজ্জনক রাজপথের লেভেলে ছয় মাসের শিশু হামাগুড়ি দিচ্ছিল এবং ফুটপাতে স্কুলের ছাত্রছাত্রী ও পথচারীদের চলাচলের মুখে কেরোসিন স্টোভের অনিয়ন্ত্রিত আগুন জ্বলছিল। কোনও বড় দুর্ঘটনা ঘটলে তার দায় কে নেবে—সেই প্রশ্ন তুলেই তিনি নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁদের সরে যেতে বলেছিলেন।
পাশাপাশি, বিরোধীদের তীব্র আক্রমণ করে মন্ত্রী বলেন, ২৮ বছরের কংগ্রেস, ৩৫ বছরের বামফ্রন্ট এবং ১৫ বছরের তৃণমূল জমানার অপশাসনের ফলে ফুটপাত আজ হকার ও অবৈধ দখলে পর্যবসিত। অতীতে ‘অপারেশন সানশাইন’-এর মতো অভিযান চালানো বাম কিংবা আবাস ও নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগে বিদ্ধ তৃণমূলের কাছ থেকে মানবিকতার পাঠ নেবেন না বলেও তোপ দাগেন তিনি। তাঁর কটাক্ষ, বিরোধীরা সহানুভূতির কান্নাকাটি করলেও কেউ ওই পরিবারের জন্য এক বাটি দুধ নিয়ে এগিয়ে যাননি, বরং ঘটনার সুযোগে ‘রাজনীতির আগুনে রুটি সেঁকছেন।’ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি জোরের সঙ্গে জানান, ফুটপাত ধনী বা দরিদ্র কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, তা পথচারীর অধিকার। রাজ্যে নতুন শিল্পপতি ও বিনিয়োগ টানতে গেলে ভাঙাচোরা নিকাশি ও যানজটমুক্ত সুন্দর পরিকাঠামো গড়া আবশ্যিক।
মন্ত্রীর এই দীর্ঘ আইনি ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যার মধ্যেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তাঁর সংবেদনহীন মানসিকতা। যদিও বক্তব্যের শেষে তিনি স্বীকার করতে বাধ্য হন, “আমি হয়তো চিৎকার করে বলেছি, সেটা হয়তো আরেকটু নরম করে, আরেকটু বুঝিয়ে বলা উচিত ছিল।” তবে এই দায়সারা অনুশোচনায় ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। সমালোচকদের মতে, ধাপা অঞ্চলে বাসস্থান থাকা সত্ত্বেও কেন তাঁরা পার্ক স্ট্রিটে এলেন—মন্ত্রীর এমন অবাস্তব সওয়াল আসলে সর্বহারা প্রান্তিক মানুষের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল। অতীতে বন্যাদুর্গত পটাশপুরে স্পিডবোটে চেপে ‘সৌন্দর্য’ আবিষ্কার কিংবা চাঁদনি চকে ফুটপাতের চায়ের দোকানে অসৌজন্যমূলক আচরণের মতোই এই ঘটনা মন্ত্রীর প্রশাসনিক অপরিণামদর্শিতা ও মানবিক দৈন্যকেই প্রকট করেছে।
এদিকে ঘটনার অভিঘাতে রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে পৌঁছেছে। সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক মানসিকতার সঙ্গে এই আচরণের তুলনা টেনে ক্ষমতার অপপ্রয়োগের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। দলের মহিলা সমিতি মন্ত্রীর প্রকাশ্যে ক্ষমার দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ নির্যাতিতা পরিবারের সঙ্গে দেখা করে পার্ক স্ট্রিট থানায় তাঁদের স্থায়ী পুনর্বাসনের দাবি তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, ফুটপাত দখলমুক্ত করা প্রয়োজন হলেও বুলডোজার বা হুমকির সংস্কৃতি নয়, পুনর্বাসনের মানবিক মুখ থাকা আবশ্যক। এক ক্ষুধার্ত শিশুর দুধের পাত্রের সামনে দাঁড়িয়ে এক মন্ত্রীর এই ক্ষমতার আস্ফালন প্রমাণ করল—নগরোন্নয়নের অন্ধ প্রতিযোগিতায় নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের মৌলিক সহমর্মিতা আজ চরম নির্বাসনে।

২০২৬ এশিয়ান গেমসের জন্য ভারতের টেনিস দল ঘোষণা

নতুন গতি © All rights reserved.| Developed by eTech Builder

শিশুর দুধের আগুনে ক্ষমতার আস্ফালন : ফুটপাতে প্রতিধ্বনিত পুরমন্ত্রীর অসংবেদনশীল রূপ

আপডেট : ২৫ অগাস্ট ২০২৬, মঙ্গলবার
ইমামা খাতুন, কলকাতা:  নগরায়ণ ও সৌন্দর্যায়নের মোড়কে ক্ষমতার চরম ঔদ্ধত্য যখন এক অসহায় ফুটপাতবাসীর উনুনকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়, তখন প্রশাসনের তথাকথিত ‘জনকল্যাণমুখী’ মুখোশটি খসে পড়ে। পার্ক স্ট্রিট সংলগ্ন ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ফুটপাতে ছ’মাসের একরত্তি শিশুর জন্য কেরোসিনের স্টোভে দুধ গরম করার অপরাধে এক বৃদ্ধা ও মায়ের উপর রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের রুদ্ররোষ প্রদর্শনের ঘটনায় তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওচিত্রে মন্ত্রীর কর্কশ কণ্ঠস্বর, ধমক এবং ক্ষমতার প্রদর্শন ঘিরে জনমানসে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। নাগরিক সমাজের স্পষ্ট অভিযোগ—শহর দখলমুক্ত করার নামে এক চরম অমানবিক ও সংবেদনহীন আচরণের নজির গড়লেন নবনিযুক্ত মন্ত্রী।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে শনিবারের একটি দৃশ্য। দেখা যায়, ফুটপাতের প্রান্তে স্টোভ জ্বালিয়ে শিশুর ক্ষুধা নিবারণের চেষ্টা করছিলেন পরিবারের সদস্যরা। সেই সময় পরিদর্শনে গিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন পুরমন্ত্রী। রাস্তার উপরে কেন এমন ‘সংসার’ পাতা হয়েছে, সেই প্রশ্নে অগ্নিশর্মা হয়ে তিনি জিনিসপত্র সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। অভিযোগ ওঠে, দুধের পাত্র ফেলে দেওয়ার উপক্রম হয়। বিরোধীদের তরফে তীব্র ভর্ৎসনা ধেয়ে আসতেই সোমবার সামাজিক মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থনে ভিডিও বার্তা দেন মন্ত্রী। তাঁর দাবি, কোনও শিশুর মুখের খাদ্য কেড়ে নেওয়া হয়নি। ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের মতো ব্যস্ত ও বিপজ্জনক রাজপথের লেভেলে ছয় মাসের শিশু হামাগুড়ি দিচ্ছিল এবং ফুটপাতে স্কুলের ছাত্রছাত্রী ও পথচারীদের চলাচলের মুখে কেরোসিন স্টোভের অনিয়ন্ত্রিত আগুন জ্বলছিল। কোনও বড় দুর্ঘটনা ঘটলে তার দায় কে নেবে—সেই প্রশ্ন তুলেই তিনি নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁদের সরে যেতে বলেছিলেন।
পাশাপাশি, বিরোধীদের তীব্র আক্রমণ করে মন্ত্রী বলেন, ২৮ বছরের কংগ্রেস, ৩৫ বছরের বামফ্রন্ট এবং ১৫ বছরের তৃণমূল জমানার অপশাসনের ফলে ফুটপাত আজ হকার ও অবৈধ দখলে পর্যবসিত। অতীতে ‘অপারেশন সানশাইন’-এর মতো অভিযান চালানো বাম কিংবা আবাস ও নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগে বিদ্ধ তৃণমূলের কাছ থেকে মানবিকতার পাঠ নেবেন না বলেও তোপ দাগেন তিনি। তাঁর কটাক্ষ, বিরোধীরা সহানুভূতির কান্নাকাটি করলেও কেউ ওই পরিবারের জন্য এক বাটি দুধ নিয়ে এগিয়ে যাননি, বরং ঘটনার সুযোগে ‘রাজনীতির আগুনে রুটি সেঁকছেন।’ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি জোরের সঙ্গে জানান, ফুটপাত ধনী বা দরিদ্র কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, তা পথচারীর অধিকার। রাজ্যে নতুন শিল্পপতি ও বিনিয়োগ টানতে গেলে ভাঙাচোরা নিকাশি ও যানজটমুক্ত সুন্দর পরিকাঠামো গড়া আবশ্যিক।
মন্ত্রীর এই দীর্ঘ আইনি ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যার মধ্যেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তাঁর সংবেদনহীন মানসিকতা। যদিও বক্তব্যের শেষে তিনি স্বীকার করতে বাধ্য হন, “আমি হয়তো চিৎকার করে বলেছি, সেটা হয়তো আরেকটু নরম করে, আরেকটু বুঝিয়ে বলা উচিত ছিল।” তবে এই দায়সারা অনুশোচনায় ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। সমালোচকদের মতে, ধাপা অঞ্চলে বাসস্থান থাকা সত্ত্বেও কেন তাঁরা পার্ক স্ট্রিটে এলেন—মন্ত্রীর এমন অবাস্তব সওয়াল আসলে সর্বহারা প্রান্তিক মানুষের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল। অতীতে বন্যাদুর্গত পটাশপুরে স্পিডবোটে চেপে ‘সৌন্দর্য’ আবিষ্কার কিংবা চাঁদনি চকে ফুটপাতের চায়ের দোকানে অসৌজন্যমূলক আচরণের মতোই এই ঘটনা মন্ত্রীর প্রশাসনিক অপরিণামদর্শিতা ও মানবিক দৈন্যকেই প্রকট করেছে।
এদিকে ঘটনার অভিঘাতে রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে পৌঁছেছে। সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক মানসিকতার সঙ্গে এই আচরণের তুলনা টেনে ক্ষমতার অপপ্রয়োগের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। দলের মহিলা সমিতি মন্ত্রীর প্রকাশ্যে ক্ষমার দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ নির্যাতিতা পরিবারের সঙ্গে দেখা করে পার্ক স্ট্রিট থানায় তাঁদের স্থায়ী পুনর্বাসনের দাবি তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, ফুটপাত দখলমুক্ত করা প্রয়োজন হলেও বুলডোজার বা হুমকির সংস্কৃতি নয়, পুনর্বাসনের মানবিক মুখ থাকা আবশ্যক। এক ক্ষুধার্ত শিশুর দুধের পাত্রের সামনে দাঁড়িয়ে এক মন্ত্রীর এই ক্ষমতার আস্ফালন প্রমাণ করল—নগরোন্নয়নের অন্ধ প্রতিযোগিতায় নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের মৌলিক সহমর্মিতা আজ চরম নির্বাসনে।