বোস্টন থেকে দীপক নন্দী: মরক্কো ফ্রান্সের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে, এমনকি জয়ও পেতে পারে কোয়ার্টার ফাইনালে। কোয়াটার ফাইনালের আগে সকলে এমনটাই মনে করছিলেন। কিন্তু সেটা কি গতকাল রাতে মরক্কো করে দেখাতে পারলো। বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, ফ্রান্স–মরক্কো ম্যাচের কোনো পর্যায়ে কি মনে হয়েছে, ফ্রান্স হারতে পারে? হার তো দূরের কথা, গোল খেতে পারে—এমনটা পুরো ম্যাচে কখনোই মনে হয়নি। দুর্দান্ত পারফর্মেন্স দেখিয়ে ফ্রান্স জিতে নিল কোয়াটার ফাইনাল। পৌঁছে গেল সেমিফাইনালে।
শুধু মরক্কো ম্যাচ নয়, পুরো বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ফ্রান্সকে হারানোর সম্ভাবনা কেউ তৈরি করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। গ্রুপ পর্ব থেকে কোয়াটার ফাইনাল পর্যন্ত ম্যাচ দেখে মনে হচ্ছে এই বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে হারানোর ক্ষমতা কোনো দল এখনো দেখাতে পারেনি।
চলতি বিশ্বকাপে দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্স মনে হচ্ছে অপ্রতিরোধ্য! বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের সেরা দলকে যদি গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর ‘পরম রূপ’ আকারে দেখা হয়, এই ফ্রান্স দল এখন পর্যন্ত সেই পরম রূপই, অর্থাৎ সেরাদের মধ্যে সেরা।
এবার মরক্কো–ফ্রান্স কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে দিকে ফেরা যাক। প্রথম মিনিট থেকেই মরক্কোর মতো দলের বিরুদ্ধে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে নেয় ফ্রান্স। ৫ মিনিটের মধ্যে দুবার এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় তারা। তবে গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াসিন বুনুর অতিমানবীয় হয়ে মরক্কোকে রক্ষা করেছে। তবে তা ছিল ক্ষণিকের। বলা হয়, ভোরের সূর্য নাকি দিনের পূর্বাভাস দেয়। একইভাবে ৫ মিনিটের মধ্যে সেই দুটি আক্রমণ ছিল পুরো ম্যাচের পূর্বাভাস। এরপর শুরু হয় ফ্রান্সের আক্রমণ–ঝড়। মিডফিল্ডে প্লেমেক করছিলেন মাইকেল ওলিসে–আদ্রিয়াঁ রাবিওরা আর আক্রমণকে পরিণতি দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন এমবাপে,দেজিরে দুয়ে ও দেম্বেলেরা।
ফ্রান্সের আক্রমণের ঢেউগুলো এমনভাবে আছড়ে পড়ছিল যে সেগুলো ঠেকানোর জন্য মরক্কোর ১১ খেলোয়াড়কে নিচে নেমে ‘বাস পার্ক’ করতে হচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে ফ্রান্সের আক্রমণের চাপ সামলাতে না পেরে এমবাপেকে বক্সের ভেতর ফাউল করেন নুসাইর মাজরাউয়ি। তবে সেই সুযোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন এমবাপে। পেনাল্টিতে এমবাপে গোল না পেলেও ফ্রান্সের সমর্থকদের স্নায়ুচাপে ভুগতে যে হয়নি। সারা ম্যাচ দেখে বোঝা যাচ্ছিল, এই ম্যাচে যদি শেষ পর্যন্ত কেউ গোল করে, তবে সেটি করবে ফ্রান্স। ম্যাচ শুরুর আগে ‘মরক্কো–ভীতি’ তৈরির চেষ্টা করা হলেও সেসব ততক্ষণে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
প্রথমার্ধে ফ্রান্সকে ঠেকিয়ে রাখা গেলেও বিরতির পর আরো ভেঙে পড়ে মরক্কোর রক্ষণ। ৬ মিনিটের মধ্যেই মধ্যেই এমবাপেরা দু’দুটো গোল করে মরক্কোকে আর মাথা তুলে দাঁড়াতে দেয়নি। ৬৬ মিনিটের মধ্যে ২ গোলে পিছিয়ে পড়ে মরক্কো তখন ম্যাচ থেকে অনেক দূর ছিটকে গেছে। এরপর যে আর ফেরার পথ ছিল না, সেটা বোধ হয় ততক্ষণে মরক্কোও বুঝে গেছে। শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সের ২–০ গোলের জয়ে শেষ হয় ম্যাচ।
অথচ ম্যাচ শুরুর আগে মরক্কোকে কঠিন প্রতিপক্ষ মনে করা হচ্ছিল। ফিফা র্যাঙ্কিংয়েও দুই দলের ব্যবধান ছিল মাত্র পাঁচ ধাপ। কিন্তু কে জানত, কোয়ার্টার ফাইনালে এমন একপেশে লড়াই হবে। ম্যাচে দুই দলের শক্তির পার্থক্য বোঝাতে একটি পরিসংখ্যানই ছিল যথেষ্ট। প্রথমার্ধে ফ্রান্স গোলের উদ্দেশ্যে শট নিয়েছে ১৩টি আর মরক্কো মাত্র ১টি, অর্থাৎ ব্যবধান ১২ শট। কোয়ার্টার ফাইনালের মতো ম্যাচে এ ব্যবধান অবিশ্বাস্য।
এমন ভালো পরিসংখ্যান দেখা গিয়েছিল ১৯৯৪ বিশ্বকাপের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে। সেবার সেমিফাইনালে সুইডেনের বিপক্ষে ব্রাজিল নিয়েছিল ১৭টি শট আর সুইডেন মাত্র ১টি। সেই ম্যাচে ব্রাজিল ১-০ গোলে জিতেছিল এবং বিশ্বকাপ জিতেছিল। এবারের বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত একবারও পিছিয়ে পড়তে হয়নি ফ্রান্সকে। এটুকু তথ্যই প্রমাণ দেয়, ফ্রান্স বিশ্বকাপে কতটা অপ্রতিরোধ্য। তবে সেমিফাইনাল ও ফাইনালে যদি প্রতিপক্ষ শুরুতে এগিয়ে যায়, তখন ফ্রান্স কীভাবে ঘুরে দাঁড়ায়, সেটি দেখার মতোই হবে।
নতুন গতি 




















